সর্বশেষ:

ধুনট: কে নেবে মা হারা ছোট্ট দুই সন্তানের দায়িত্ব? »

ধুনট: কে নেবে মা হারা ছোট্ট দুই সন্তানের দায়িত্ব?

নাতনিদের আসার খবর পেলেই বৃদ্ধ সাইফুল ইসলাম বাড়ির কাছে চৌরাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। ওদিকে কে কার আগে নানার কাছ থেকে চকলেট নিতে পারে এজন্য বাস থেকে নেমেই দৌড় শুরু করতো দুই বোন- হুমায়রা ইয়াসমিন ওহী এবং রাহিয়া ইয়াসমিন রাহী। ৭০ বছর বয়সী সাইফুল ইসলামের সঙ্গে তার দুই নাতনির এই খুনসুটি প্রতিবেশীরাও বেশ উপভোগ করতো।মুহূর্তের মধ্যেই বদলে গেল দৃশ্যপট। বুধবার দুই নাতনির আসার খবর পেয়েও ঘর ছেড়ে বের হননি সাইফুল ইসলাম। সদ্য মা হারানো দুই নাতনির মুখোমুখি হওয়ার সামর্থ্যটুকুও হয়তো হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। এবার নানার পরিবর্তে ওহী ও রাহীকে এগিয়ে নিতে বগুড়ার ধুনট উপজেলা সদরের পশ্চিম ভরণশাহী চৌরাস্তায় এসেছিলো প্রতিবেশীরা। কিন্তু সাবিনা ইয়াসমিনের কফিনের পাশে ওহী-রাহীকে দেখে তারাও নিজেদের চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন নি।

মমতাময়ী মা আর বেঁচে নেই। এই নির্মম সত্যটা ইতোমধ্যেই বুঝে গেছে ৯ বছর বয়সী ওহী। কিন্তু ওহীর ছোট বোন রাহী মা হারানোর বেদনা হয়তো এখনো বুঝে উঠতে পারেনি। এমন গুমোট পরিবেশে একবার বোনের দিকে, আরেকবার বাবা রফিকুল ইসলামের দিকে তাকাচ্ছিলো পাঁচ বছর বয়সী অবুঝ রাহী। 

বুধবার দুপুর একটার দিকে নিহত সাবিনা ইয়াসমিনকে বহনকারী লাশবাহী গাড়ি বগুড়ার ধুনট উপজেলা সদরের পশ্চিম ভরণশাহী গ্রামে তার বাবার বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। নিহত সাবিনাকে শেষবারের মত দেখতে এসে তার কফিনের পাশে থাকা ছোট্ট দুই মেয়ের দিকে তাকানোর সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারছিলেন না গ্রামবাসী। দুই শিশুকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো ভাষাই তাদের কারো কাছে ছিল না।

মেয়েকে হারিয়ে সাবিনার বাবা সাইফুল ইসলাম যেন পাগলপ্রায়। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মেয়ে-জামাই ও দুই নাতনি প্রতি বছরই ঈদের আমার বাড়ি আসতো। এবারও তাদের আসার কথা ছিল। দু’দিন আগে আমি তাবলীগে যাবার আগে মেয়েকে ফোন করেছিলাম। তখন ঈদের ছুটিতে আসার কথা জানিয়েছিল। আমার মেয়েটা এলো ঠিকই। কিন্তু লাশ হয়ে। দুই নাতনির দিকে তাকাতেও পারছি না। সেই শক্তি-সাহস কোনোটাই আমার নেই।’

সাবিনা ইয়াসমিনের ছোট ভাই পারভেজ আলম জানান, সিরাজঞ্জের কাজিপুর উপজেলার সাউটতলা গ্রামের বাসিন্দা নৌবাহিনীর সদস্য রফিকুল ইসলামের সঙ্গে প্রায় পনের বছর আগে তার বোনের বিয়ে হয়। দুই বছর আগে রফিকুল ইসলাম নৌবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে বেসরকারি একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন।

সাবিনার ভাই বলেন, ‘আমার বোন তার দুই মেয়েকে বড় অফিসার বানানোর স্বপ্ন দেখতেন। এজন্য তাদের নিয়ে ঢাকার ভাসানটেক এলাকায় বসবাস করতেন। সেখানে নৌবাহিনীর স্কুলে দুই মেয়েকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাস্ট পরিবহনের বাস আমার বোনকে হত্যা করে তার স্বপ্নকেও ধুলিস্যাৎ করে দিল।’

বুধবার যোহরের নামাজের পর জানাজা শেষে সাবিনা দাফন সম্পন্ন হয়। প্রিয়তমা স্ত্রীকে চিরনিদ্রায় শায়িত করে দুই মেয়েকে আগলে বাড়ির আঙিনায় বসেছিলেন রফিকুল ইসলাম। স্ত্রী হারানো রফিকুলকে বারবার সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তার স্বজনরা।

স্বজনদের সকল সান্ত্বনাই ব্যর্থ হচ্ছিলো স্ত্রী হারানো রফিকুলের শোকের কাছে। চাপা কণ্ঠে বার বার তিনি বলে উঠছিলেন, ‘আমার সকল স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হয়ে গেল। ঘাতক বাস আমার সুখের সংসারটাকে তছনছ করে দিল। এখন অবুঝ এই দুই সন্তানকে নিয়ে কি করবো? কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো? কে নেবে মা হারা ছোট্ট দুই সন্তানদের দায়িত্ব?’ সমকাল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নিউজটি পড়েছেন 595 জন

আর্কাইভস